Aliexpress INT
Published On: Sun, Feb 5th, 2017

ইকোনমিস্টের চোখে ডনাল্ড ট্রাম্প

-মানবজমিন
এক বিপ্লবের কবলে ওয়াশিংটন। ডনাল্ড ট্রাম্প যখন বিস্ফোরক সব নীতি আর নির্বাহী আদেশের বোমা ফাটাচ্ছেন তখনো গত মাসের শপথ অনুষ্ঠানের মলিন আবহ রয়ে গেছে বাতাসে। তিনি থামেন নি। ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বাদ দিয়েছেন। নাফটা পুনঃসমঝোতার দাবি জানিয়েছেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কথা বলেছেন। অভিবাসন ঢেলে সাজাচ্ছেন। উষ্ণতা দেখিয়েছেন রাশিয়া আর ব্রেক্সিটের পথে থাকা বৃটেনকে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি শীতলতা। নির্যাতনের পক্ষে কথা বলেছেন। চড়াও হয়েছেন গণমাধ্যমের ওপর। তিনি ও তার শিবিরের লোকজন এগিয়ে চলেছেন। পেছনে ফেলে যাচ্ছেন তাদের আগমনে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা অভিমতের ধ্বংসাবশেষ। সমালোচকদের চোখে মি. ট্রাম্প বেপরোয়া আর বিশৃঙ্খল। গত সপ্তাহে সাতটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞায় এটি যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা আর কোথাও হয়নি। এটা প্রস্তুত করা হয়েছে গোপনে। তা আইনে পরিণত করা হয়েছে তড়িঘড়ি করে। আর আমেরিকাকে সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্ত করার ঘোষিত লক্ষ্য এর মাধ্যমে অর্জন করার সম্ভাবনা কম। এমনকি তার রিপাবলিকান মিত্ররাও আফসোস করেছেন যে, চমৎকার ও জনপ্রিয় একটি নীতির বারোটা বেজেছে প্রয়োগের ধরনে। রাজনীতিতে সাধারণত বিশৃঙ্খলা ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়। মি. ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে বিশৃঙ্খলা তার পরিকল্পনার অংশ। নির্বাচনী প্রচারণায় যেসব প্রতিশ্রুতি অত্যুক্তি মনে হয়েছিল, এখন তা ওয়াশিংটন ও বিশ্বকে নাড়া দেয়ার লক্ষ্যে মারাত্মক এক বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। মি. ট্রাম্পের বিদ্রোহ বোঝার জন্য জনক্ষোভের ব্যবহার দিয়ে শুরু করা যাক। বিভক্ত আমেরিকায় যেখানে অপর পক্ষের মতো শুধু ভুল নয় বরং ক্ষতিকর হিসেবে দেখা হয়, সেখানে দ্বন্দ্ব হলো একটি রাজনৈতিক সম্পদ। শোভন অভিমতকে চটানোর জন্য মি. ট্রাম্প তার ক্ষ্যাপাটে বক্তব্য যত বেশি ব্যবহার করেছেন, তার সমর্থকরা তত বেশি নিশ্চিত হয়েছেন যে, তিনি সত্যিই ওয়াশিংটনের ক্ষমতাবলয় থেকে বিশ্বাসঘাতক, লোভী সম্ভ্রান্তদের উৎখাত করবেন। তার ‘প্রধান বোমা নিক্ষেপকারী’ স্টিফেন ব্যানন ও স্টিফেন মিলার এখন ওই যুক্তিকেই যোগ করিয়েছেন সরকারে। প্রতিবার যখন প্রতিবাদকারী ও গণমাধ্যম মি. ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যায়, সেটাই প্রমাণ হয় যে, তিনি কিছু না কিছু সঠিকভাবেই করে যাচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের ‘ওয়েস্ট উইং’ থেকে আসা বার্তাগুলো যদি গোলমেলে হয়, তাহলে এটাই প্রমাণ করে যে মি. ট্রাম্প এক কথার মানুষ। যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটাই করবেন। অভিবাসন নিষেধাজ্ঞার গোপনীয়তা ও বিভ্রান্তি ব্যর্থতার লক্ষণ নয়, বরং তার লোকজন কিভাবে স্বার্থপর বিশেষজ্ঞদের পরিহার করছেন তারই লক্ষণ; যেসব বিশেষজ্ঞরা স্বভাবগতভাবে জনইচ্ছার বিরুদ্ধে যান। দ্বন্দ্বের রাজনীতি এমন এক বিশ্বের সঙ্গে জুড়ে আছে যা কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বাণিজ্য ও পরিবেশ পর্যন্ত সবকিছু যেসব বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো পরিচালনা করে, কৌশলগতভাবে তাদের জন্য মি. ট্রাম্পের সময় নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, তুলনামূলক ছোট দেশগুলো বেশির ভাগ সুবিধা ভোগ করছে যেখানে আমেরিকা সেগুলোর বিল বহন করছে। আরো ভালো চুক্তি পাওয়ার জন্য এক একটা করে দেশকে চিহ্নিত করে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতার সুবিধা নিতে পারে আমেরিকা। মি. ব্যানন ও অন্যরাও কৌশলগতভাবে মার্কিন কূটনীতিকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তারা বিশ্বাস করেন বহুপাক্ষিকতা সেকেলে লিবারেল আন্তর্জাতিকতাবাদ ধারণ করে। আজকের আদর্শিক সংগ্রাম বিশ্বজনীন মানবাধিকার নয়, বরং অন্যান্য সভ্যতা বিশেষ করে ইসলামের পরাক্রম থেকে ‘জুডিও-ক্রিস্টিয়ান’ সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, জাতিসংঘ আর ইইউ হলো প্রতিবন্ধকতা এবং এ মুহূর্তে সম্ভাব্য মিত্র হলেন ভ্লাদিমির পুতিন। মি. ট্রাম্প কতটা গভীরভাবে এগুলো বিশ্বাস করে তা কেউ বলতে পারেন না। ক্ষমতার খোলসের মধ্যে একসময় হয়তো তিনি গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত হবেন। হয়তো, স্টক মার্কেটের কোনো পরিবর্তন দেশের শীর্ষ নির্বাহীকে এতোটা উদ্বিগ্ন করে দেবে যে তিনি মি. ব্যাননকে সরিয়ে দেবেন। হয়তো কোনো সংকট তাকে বাধ্য করবে নিজের চিফ অব স্টাফ এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শরণাপন্ন হতে। আর প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয়ের কেউই বিদ্রোহী ধাঁচের নয়। কিন্তু এটা দ্রুত ঘটবে সে ভরসা করবেন না। আর এসবের আগে যে ক্ষতি হতে পারে সেটাও খাটো করে দেখবেন না। যেসব আমেরিকান মি. ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করেন, স্বভাবতই তারা শঙ্কা বোধ করেন ট্রাম্প নিজ দেশে কি ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। তাদের উদ্বেগটা ঠিক। কিন্তু নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও আইনের তরফে কিছু সুরক্ষা তাদের রয়েছে। বিশ্বমঞ্চে অবশ্য, মি. ট্রাম্পকে নিবৃত্ত করার উপায় কম। পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। মার্কিনিদের সক্রিয় সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছাড়া, বৈশ্বিক সহযোগিতার কল-কব্জা ব্যর্থ হতে পারে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন নিজ নামের যোগ্য নাও থাকতে পারে। জাতিসংঘ অব্যবহৃত অবস্থায় চলে যেতে পারে। খর্ব হতে পারে অসংখ্য চুক্তি ও সমঝোতা। এগুলোর প্রতিটি স্বতন্ত্র হলেও তা একসঙ্গে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে যা মিত্রদের সঙ্গে আমেরিকার বন্ধন সৃষ্টি করে এবং বিশ্বজুড়ে আমেরিকার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। যেহেতু, সহযোগিতার অভ্যাস তৈরি হয়েছে দশকের পর দশক ধরে তা সহজেই ফের জোড়া লাগানো যাবে না; ক্ষতি হবে দীর্ঘমেয়াদি। অবিশ্বাস আর পাল্টা অভিযোগের আবর্তে, বিশ্বকে নিয়ে অসন্তুষ্ট দেশগুলো এটা পরিবর্তনে প্রলুব্ধ হবে- প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে। তাহলে করণীয় কি? প্রথম কাজ হলো ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা। মি. ট্রাম্পকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো অর্থ নেই। তাকে মধ্যপন্থি রিপাবলিকান ও আমেরিকার মিত্রদের বলতে হবে কেন মি. ব্যানন ও তার সম-ভাবাদর্শপন্থি সহকর্মীরা ভুল। আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থের সঙ্কীর্ণতম চেতনাতেও, দ্বিপক্ষীয়বাদের জন্য তাদের বাসনা হলো ভ্রান্ত। দ্বিপক্ষীয় নানা সম্পর্কজালের জটিলতা ও পরস্পরবিরোধিতা থেকে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে তা জটিলতর সমঝোতা থেকে প্রত্যাশিত কোনো অর্জন থেকে বেশি। মি. ট্রাম্পকে এটাও বোঝানো প্রয়োজন যে, মিত্ররা আমেরিকার শক্তির সব থেকে বড় উৎস। তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা যেমনটা তাদেরকে বৈশ্বিক সুপারপাওয়ার বানায়, ঠিক ততটাই বড় ভূমিকা পালন করে তাদের স্বতন্ত্র নেটওয়ার্ক। মিত্ররা আমেরিকার বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে আমেরিকাকে উপরে রাখতে সহায়তা করে- পূর্ব এশিয়ায় চীন, পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান। ট্রাম্প যদি সত্যিই আমেরিকাকে আগে রাখতে চান, তার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বন্ধন দৃঢ় করা, মিত্রদের সঙ্গে অবজ্ঞার আচরণ করা নয়। আর এই পরামর্শ যদি উপেক্ষিত হয়? আমেরিকার মিত্রদেরকে অবশ্যই মি. ট্রাম্প যুগের পরদিনের জন্য বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করার লড়াই করতে হবে। তাদের এটা করতে হবে নিজ নিজ অর্থনীতি জোরদার করা এবং নিজেদের মধ্যকার বৈরিতা কমিয়ে আনার মাধ্যমে। আর তাদেরকে মার্কিন নেতৃত্ববিহীন একটি বিশ্বের পরিকল্পনা করতে হবে। কেউ যদি এই ভূমিকায় চীনকে দেখতে প্রলুব্ধ হোন, তাদের বলছি, এটা কাঙ্ক্ষিত হলেও, চীন এখনো প্রস্তুত নয়। ন্যাটোতে কম অর্থায়ন করার বিলাসিতা করার সুযোগ ইউরোপের আর নেই। ইইউ’র পররাষ্ট্র সেবার (ফরেইন সার্ভিস) পরিধি কমিয়ে আনার সুযোগও নেই যেটা ইউরোপের জন্য মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিকটতম সমতুল্য। ল্যাতিন আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করার জন্য ব্রাজিলকে অবশ্যই প্রস্তুত হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিবদমান আরব রাষ্ট্রগুলোকে ইরানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য ফর্মুলা খুঁজে বের করতে হবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে যে বিশ্বকে পেয়েছেন তার চেয়েও আমেরিকার জন্য স্পষ্টত খারাপ হলো দ্বিপক্ষীয়বাদ ও একটি অদূরদর্শী আঞ্চলিকতাবাদ। কতটা খারাপ সেই উপলব্ধি করার এখনো সময় আছে। নিজের বোমারু কর্মকর্তাদের বাদ দেয়া ও পথ পরিবর্তনের জন্য সময় ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্বের উচিত ওই ফলের আশা করা। কিন্তু তাদেরকে অবশ্যই ঝামেলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
(লন্ডনের দ্য ইকোনমিস্টের ‘অ্যান ইনসার্জেন্ট ইন হোয়াইট হাউস’ শীর্ষক নিবন্ধ থেকে অনূদিত। অনুবাদ করেছেন হাসনাইন মেহেদী।)

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

Aliexpress INT

ইকোনমিস্টের চোখে ডনাল্ড ট্রাম্প